প্রসঙ্গ: বুলবুল চৌধুরী’র ‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’ গ্রন্থ আলোচনা

লক্ষ্মী একটি মেয়ের নাম। যিনি এই উপনাসের কথক এবং প্রধান চরিত্র। বাংলা সিনেমায় যাকে নায়িকা বলা হয়। লক্ষ্মী একজন যৌনকর্মী। “এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে ” যৌনপল্লীর একটি ঘরের নাম। যা লেখা আছে লক্ষ্মীর ঘরের দরজায়। যে ঘরে খদ্দেরের সঙ্গে পয়সার বিনিময় যৌনাচারে লিপ্ত হয় লক্ষ্মী। লক্ষ্মী হিতেশ আচার্যের পালিত মেয়ে। হিতেশ আচার্য খিলগাঁও সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। নিশিপুর রেলস্টেশন থেকে কুঁড়িয়ে এনেছিলেন লক্ষ্মীকে।

hero

লক্ষ্মী একটি মেয়ের নাম। যিনি এই উপনাসের কথক এবং প্রধান চরিত্র। বাংলা সিনেমায় যাকে নায়িকা বলা হয়। লক্ষ্মী একজন যৌনকর্মী। “এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে ” যৌনপল্লীর একটি ঘরের নাম। যা লেখা আছে লক্ষ্মীর ঘরের দরজায়। যে ঘরে খদ্দেরের সঙ্গে পয়সার বিনিময় যৌনাচারে লিপ্ত হয় লক্ষ্মী। লক্ষ্মী হিতেশ আচার্যের পালিত মেয়ে। হিতেশ আচার্য খিলগাঁও সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। নিশিপুর রেলস্টেশন থেকে কুঁড়িয়ে এনেছিলেন লক্ষ্মীকে। লক্ষ্মীর বর্ণনা মতে “হিতেশ আচার্য নিশিপুর রেলস্টেশন থেকে আমাকে তুলে এন কন্যা-গ্রহণ দিলেন। তিনি প্রথম যেদিন আমাকে দেখেন, সেদিন তার দু’পা নাকি আঁকড়ে ধরেছিলাম। তার সেই বন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা চালাতে আমি নাকি আরও জোর আঁকড়ে ধরেছি তার পা। পাশে পাশে বেড়েছে কান্নার বেগও। খবর পেয়ে অদূরে অবস্থিত থানার দারোগা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া শিক্ষক হিতেশ আচার্যকে তিনি শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। আর হ্যাঁ সেদিন এক অবোধ শিশু হিতেশ আচার্যের পা জড়িয়ে থাকার দৃশ্য দেখে দারোগা নাকি বলেছিলেন, স্যার, ওর আপনজন কাছে থাকলে এতক্ষণে ছুটে আসত। এ যে নিজের নাম ছাড়া কিছুই জানাতে পারছে না। আমি বলি কি, মেয়েটিকে নিজের কাছে রাখুন। পরে খোঁজখবর নিয়ে ব্যাপারটার নিশ্চয় হদিস করতে পারব। তখন না হয় গতি  করা যাবে। হিতেশ আচার্যের আশ্রয় পেলাম বটে। কিন্তু দারোগার সেই অনুসন্ধান পর্ব ফাইলবন্দি হয়ে চাপা পড়ে গেল সময়ের অতলে। তাই আমার জন্মদাতা-জন্মদাত্রীর নাম-ঠিকানা আজও অজ্ঞাতের তালিকায়। মাঝে হিতেশ আচার্য অবশ্য কৃত্তিকা দেবীর পরমর্শে পত্রিকার পাতায় হারিয়ে যাওয়া লক্ষ্মীর ছবি আর সংক্ষিপ্ত বিবরণ ছাপিয়ে প্রত্যুত্তরের অপেক্ষায় ছিলেন। বলা বাহুল্য, তাতে সমাধান মেলেনি। ”

হিতেশ আচার্যের ঘরে ছিলো তার দুই কন্যা ও এক ছেলে। তবুও হিতেশ আচার্য ও তার স্ত্রী যশোদা দেবী নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ  করতেন লক্ষ্মীকে। “ স্ত্রী,  দু’মেয়ে এবং ছেলেকে ঘিরে তার সুখের সংসার ছিল। আপন ঔরসে পাওয়া সন্তানদের যেমন রক্তসূত্রের নই সত্ত্বেও আমাকে তেমন স্নেহ দিয়েছে তিনি। প্রয়োজনে কিংবা তার সামনাসামনি হওয়ামাত্রই প্রথমেই বলতেন , মা লক্ষ্মী, কেমুন আছো তুমি ?” 

হিতেশ আচার্যের বড় ছেলেকে মনে মনে পছন্দ করে লক্ষ্মী। তাকে দাদার বদলে প্রেমিক হিসেবে ভাবতে অধিক ইচ্ছে হয়। কিন্তু সামাজিক রীতিনীতির কারণে ভালোবাসি এই কথাটি বলা হয়ে ওঠেনি তাকে। দ্বিতীয়বারের মতো লক্ষ্মীর হৃদয়ে প্রেম জেগে উঠে বংশীবাদক আরমান খানের প্রতি। কিন্তু আরমান খান মুসলমান। লক্ষ্মী হিন্দু ঘরে পালিত। ধর্মীয় এবং সামাজিক নিয়মে ভেঙে হিন্দু-মুসলসমান প্রেম কিংবা ভালবাসা কোনো সহজ ঘটনা নয়। তাই লক্ষ্মী নিজের বুকের অতলে নীরবে পুষে রাকেন আরমান খানের প্রতি তার ভালোলাগা ভালোবাসা। 

হিতেশ আচার্যের বড় ছেলেকে মনে মনে পছন্দ করে লক্ষ্মী। তাকে দাদার বদলে প্রেমিক হিসেবে ভাবতে অধিক ইচ্ছে হয়। কিন্তু সামাজিক রীতিনীতির কারণে ভালোবাসি এই কথাটি বলা হয়ে ওঠেনি তাকে। দ্বিতীয়বারের মতো লক্ষ্মীর হৃদয়ে প্রেম জেগে উঠে বংশীবাদক আরমান খানের প্রতি। কিন্তু আরমান খান মুসলমান। লক্ষ্মী হিন্দু ঘরে পালিত। ধর্মীয় এবং সামাজিক নিয়মে ভেঙে হিন্দু-মুসলসমান প্রেম কিংবা ভালবাসা কোনো সহজ ঘটনা নয়। তাই লক্ষ্মী নিজের বুকের অতলে নীরবে পুষে রাকেন আরমান খানের প্রতি তার ভালোলাগা ভালোবাসা। 

অবশেষে সামাজিক নিয়মে বিভাস আচার্যের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় লক্ষ্মী। বিভার্স আচার্য ধনী ব্যবসায়ী।  স্ত্রীকে যথেষ্ট ভালোবাসেন। হাত খরচা বাবদ অনেক টাকা দেন।  কিন্তু তার একটা দোষ আছে। প্রতিরাতে মদ পান করে। লোক বলে  লক্ষ্মীর তুলনায় স্বামীর বয়স বেশি।  আর একটা রোগ আছে। পুরুষত্বের দূর্বলতা। পুরোপুরি অক্ষম হয় তবে পূর্ণ তৃপ্তির উপযোগী নয়। লক্ষ্মী তার স্বামীর উপর সন্তুষ্ট নয়। হঠাৎ একরাতে কিছুটা দুঃস্বপ্নের মতো কথার মায়ায় পড়ে লক্ষ্মী যৌন মিলনে আবদ্ধ হয় তার প্রয়াত শ্বশুরের বন্ধু গৌরকিশোর মহলানবীশের সঙ্গে। “কথা বড় মোহজাল। নইলে কেন গৌরকিশোর মহলানবীশের কথার বাণে আটকা পড়েছিলাম। অথচ বিপদে পড়ে তাঁর সাহায্য চাইলে উত্তর এসেছিল, সবই ভবিতব্য রে মা, ভবিতব্য। ”

ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে তার স্বামী প্রথমে তার হাতের রগকেটে মেরে ফেলবার চেষ্টা করে। এতে বেঁচে গেলে পুর্ণবার তাকে বিষ পান করে হত্যা করার চেষ্টা করে। এত কিছুর সত্ত্বেও লক্ষী অদৃশ্যের অশেষ কৃপায় বেঁচে যায়। স্বামীর বাড়ির লোকজন তাকে  একটি  হাসপাতালে ভর্তি করে। জ্ঞান ফেরার পর সে নার্সের মাধ্যমে জানতে পারে যে, সে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। তাই তার স্বামীর লোকজন তাকে এখানে রেখে গেছে। আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে হাসপাতাল থেকে পালায় লক্ষ্মী। ঢাকার যাওয়ার জন্য সে অপেক্ষা করতে থাকে নিশিপুর রেলস্টেশনে। এই নিশিপুর প্লাটফর্মেই লক্ষ্মীর সাথে পরিচয় মমতাজ খালার। মাঝবয়সি  সাদাটে বরণ এই মহিলা এগিয়ে এসে লক্ষ্মীকে বলে- কই যাবে গো তুমি ? লক্ষ্মী নিজের অজান্তে  উত্তর দেয়—যে দিকে দু’চোখ যায়। মমতাজ খালা বলে—ওমা, কী কথা। রাগ কইরা বাড়ি ছাইড়া আসলা নাকি মাইয়া। তাঁর জিজ্ঞাসায় নীরবতাই শুধু ফিরিয়ে দেয় লক্ষ্মী। সে ভাব বুঝে মমতাজ বেগম বললেন, ঘটনা আছে গো তোমার। তাও তোমার লাগি আমার কেমুন জানি মায়া পড়ছে। যাইবানি আমার লগে? লক্ষ্মী বলে—কই ? থাকি আমি দৌলতদিয়ায়। ওইখানে গেলে খাওন-লওন আর শোওনের ঘর পাইবা তুমি। ওই সুযোগে নিজে কোনো না কোনো কাম বাগাইয়া লইয়া আমার ঋণ শোধ করলেই হইলো। সহজ সরল লক্ষ্মী কোনো কিছু না বুঝেই সায় জানায় মমতা খালার প্রস্তাবে। তারপর মমতাজ খালা তাকে নিয়ে যায় দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে। পরে জানা যায় মমতাজ বেগম দৌলতদিয়া যৌন পল্লীর একজন সিনিয়র পিসি। এভাবেই মমতাজ খালার আওতায় নটীর খাতায় জুড়ে দেওয়া হয় আর একটি নাম—লক্ষ্মী দেবী। 

সহজ সরল লক্ষ্মী কোনো কিছু না বুঝেই সায় জানায় মমতা খালার প্রস্তাবে। তারপর মমতাজ খালা তাকে নিয়ে যায় দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে। পরে জানা যায় মমতাজ বেগম দৌলতদিয়া যৌন পল্লীর একজন সিনিয়র পিসি। এভাবেই মমতাজ খালার আওতায় নটীর খাতায় জুড়ে দেওয়া হয় আর একটি নাম—লক্ষ্মী দেবী। 

হঠাৎ একদিন শুটিংএর কাজে লক্ষ্মীর ঘরে প্রবেশ করে কথাসাহিত্যিক হাসনাইন ইতমিয়াজ। লক্ষ্মী তার মায়ার বন্ধনে বেঁধে ফেলে কথাসাহিত্যিক হাসনাইন ইতমিয়াজকে। তার সঙ্গে নিজের আগ্রহেই শারীরিক সম্পর্ক লিপ্ত হয় লক্ষ্মী। বহুদিন বাদে প্রথমবারের মতো চরম সুখ অনুভব করে মিলনে।  বন্ধুত্ব হয় তাদের মধ্যে। কথাসাহিত্যিক হাসনাইন ইতমিয়াজ বলেছিলেন— লক্ষ্মীকে নিয়ে তিনি একখানা গল্প লিখবেন। হাসনাইন ইতমিয়াজ চলে যাবার পর লক্ষ্মী মনে মনে ভাবলেন—“আমার জীবনের কী-ইবা জানেন তিনি। তার চেয়ে নিজের কথা নিজেই লিপিবদ্ধ করি না কেন। অন্যে তা না পড়ুক, আমার কথাসাহিত্যিক বন্দুর দুয়ারে তো পৌঁছান যাবে পান্ডুলিপিখানা।” লক্ষ্মীর নিজেই লিখেন তার নিজের জীবনের কথা। যার নাম “এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে”। 

Category: Book

Tags:

Share with others